রাশিয়ার স্পুটনিক ভি ভ্যাকসিন কতটা কার্যকর?

ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে ভ্যাকসিন প্রাপ্তিতে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়ায় বিকল্প উৎস থেকে ভ্যাকসিন সংগ্রহ করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে।

 

সম্প্রতি ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর জরুরিভিত্তিতে রাশিয়ার তৈরি করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন স্পুটনিক ভি ব্যবহারের অনুমতি দেয়ায় ভ্যাকসিনটির কার্যকারিতা নিয়ে জনমনে অনেক কৌতূহল দেখা যাচ্ছে।

কার্যকারিতা

প্রভাবশালী মেডিকেল জার্নাল ল্যানসেটে প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী, স্পুটনিক ভি টিকার কার্যকারিতা ৯১.৬ শতাংশ। মস্কোর বিভিন্ন ক্লিনিকে ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী ২২ হাজার প্রাপ্তবয়স্কের ওপর তৃতীয় ট্রায়াল হতে এ ফলাফল পাওয়া যায়। অতএব এটি বলা যায় যে, স্পুটনিক ভি ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।

সম্প্রতি মস্কোর গামালিয়া ইনস্টিটিউট এবং রাশিয়ান ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড ৩৮ লাখ ভ্যাকসিন গ্রহীতার তথ্য বিশ্লেষণ করে জানিয়েছে যে, স্পুটনিক ভি ভ্যাকসিন ৯৭.৬ শতাংশ কার্যকর। তবে গবেষণার এ ফলাফল এখনো কোনো জার্নালে প্রকাশিত হয়নি।

উল্লেখ্য, স্পুটনিক ভি ভ্যাকসিনটি আবিষ্কার করেছে রাশিয়ার গামালিয়া ন্যাশনাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব এপিডেমিওলজি অ্যান্ড মাইক্রোবায়োলজি। গামালিয়া গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রধান আলেকজান্ডার গিন্সবার্গের মতে, রাশিয়ার তৈরি স্পুটনিক ভি করোনাভাইরাস ভ্যাকসিনটি সব বয়সের জন্য সমানভাবে সফল এবং নিরাপদ বলে প্রমাণিত হয়েছে। ক্লিনিকাল ট্রায়াল অথবা স্পুটনিক ভি ভ্যাকসিনের ম্যাস ভ্যাকসিনেশন চলাকালীন ভ্যাকসিন গ্রহণের পরে রক্ত জমাট বাঁধার বা সেরিব্রাল ভেনাস সাইনাস থ্রোম্বোসিসের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে অন্যান্য টিকার মতো সাধারণ কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া (জ্বর, গা-ব্যথা, ইঞ্জেকশনের স্থলে লাল হয়ে যাওয়া) দেখা গেছে।

স্পুটনিক ভি কীভাবে কাজ করে

ভ্যাকসিনটি অনেকটা অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের অনুরূপ। জেনেটিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অ্যাডিনোভাইরাস ভেক্টরের মধ্যে নোভেল করোনাভাইরাসের একটি জিন প্রবেশ করিয়ে দেয়া হয়েছে; যা করোনাভাইরাসের স্পাইক প্রোটিন তৈরিতে সক্ষম।

এই স্পাইক প্রোটিনটিই শরীরে করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে রোগ প্রতিরোধক ব্যবস্থা গড়ে তোলে। এ টিকাও দুই ডোজে দেওয়া হয়। প্রথম ডোজ দেওয়ার ২১ দিন পর দ্বিতীয়টিl

তবে একটি উল্লেখযোগ্য পার্থক্য হলো প্রথম এবং দ্বিতীয় ডোজটির জন্য দুটি ভিন্ন অ্যাডেনোভাইরাস ভেক্টর (rAd26 এবং rAd5)  ব্যবহার করা হয়। গ্যামালিয়ার দাবি হচ্ছে যেহেতু তারা তাদের ভ্যাকসিনের প্রাথমিক ডোজ এবং দ্বিতীয় ডোজে দুই ধরনের ভাইরাস ভেক্টর ব্যবহার করছে সেহেতু স্পুটনিক ভি অন্যান্য ভ্যাকসিনের চেয়ে বেশি দিন প্রতিরক্ষা দেবে।

রাশিয়ার ভ্যাকসিন অনুমোদনকারী দেশসমূহ

স্পুটনিক ভি বাংলাদেশসহ এখন পর্যন্ত ৬২টি দেশের ওষুধ মন্ত্রণালয় দ্বারা স্বীকৃত প্রাপ্ত। বিভিন্ন দেশ স্থানীয়ভাবে স্পুটনিক ভি উৎপাদন করছে; পাশাপাশি রাশিয়া থেকে আমদানি করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।

দক্ষিণ কোরিয়া ইতোমধ্যে রাশিয়ার ভ্যাকসিন উৎপাদন প্রক্রিয়া শুরু করেছে। মে মাসে রাশিয়ার ভ্যাকসিন গ্রহণ করা শুরু করবে ভারত।

আরডিআইএফ আরও দাবি করেছে, ভারতে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান বছরে ৮৫ কোটির বেশি স্পুটনিক ভি’র ডোজ তৈরি করবে। পাশাপাশি চীনের তিনটি ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান গত তিন সপ্তাহে রাশিয়ার আরডিআইএফের সাথে মিলিত হয়ে ২৬০ মিলিয়ন ডোজ ভ্যাকসিন উৎপাদন চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে।

তবে স্পুটনিক ভি এখনও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইউরোপীয় মেডিসিন এজেন্সি দ্বারা অনুমোদিত হয়নি। সম্প্রতি রাশিয়ার ভ্যাকসিনটি আমদানি না করার সিদ্ধান্ত নেয় ব্রাজিল। অপরদিকে হাঙ্গেরি সরকার দেশটিতে ভ্যাকসিন গ্রহীতাদের তথ্য বিশ্লেষণ করে দাবি করেছে, স্পুটনিক ভি ভ্যাকসিনটি অন্য সব ভ্যাকসিন থেকে বেশি কার্যকর। বিশ্লেষকরা মনে করছেন ব্রাজিল এবং হাঙ্গেরির দাবির পেছনে রাজনৈতিক কারণ থাকতে পারে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে স্পুটনিক ভি

দুই থেকে আট ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় এই ভ্যাকসিনটির শুষ্ক (ফ্রিজ-ড্রাইড) ফর্মুলেশনটি সংরক্ষণ করা যায়; যা বাংলাদেশের কোল্ড চেইনের জন্য উপযুক্ত। এক ডোজ স্পুটনিক ভি টিকার দাম আন্তর্জাতিক বাজারে ১০ ডলারেরও কম।

এখানে একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, রাশিয়া তাদের স্পুটনিক ভি টিকা বাংলাদেশে তৈরির ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এতে বাংলাদেশের নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং অল্প সময়ে অধিক পরিমাণ ভ্যাকসিন উৎপাদন করতে পারবে।

ফলে অপেক্ষাকৃত দ্রুততম সময়ে বিপুল জনগোষ্ঠীকে ভ্যাকসিনের আওতায় আনা সম্ভব হবে এবং বাংলাদেশ করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে সমষ্টিগত প্রতিরক্ষা (হার্ড ইমিউনিটি) অর্জন করতে পারবে।

বিশ্লেষণ: ডা. রামিশা মালিহা, নাফিসা নীড়, ডা. শাহরিয়ার রোজেন
(সেন্টার ফর রিসার্চ, ইনোভেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অ্যাকশন)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *