ঢাকাআজ শুক্রবার ২২শে জুন, ২০১৭ ইং ৯ই আষাঢ়, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ২৭শে রমযান, ১৪৩৮ হিজরীরাত ৪:১৫

46 বার পড়া হয়েছে «

নড়াইলে ঐতিহ্যের চিরচেনা বর্তমানে নৌকার কারিগররা অন্য পেশায় ঝুঁকে

নড়াইল জেলা প্রতিনিধি : “তুমি বেশ বদলে গেছোৃপুরনো সৈকতে আর পানসি ভেড়াও না’ কিংবা ‘মন মাঝি তোর বৈঠা নেরে আমি আর বাইতে পারলাম না’ একসময় নৌকায় চড়ে দূরে কোথাও যাতায়াত কিংবা নতুন বৌকে নৌকায় চড়িয়ে বাবার বাড়ি থেকে স্বামীর বাড়িতে আনার সময় মাঝি-মাল্লার এসব ভাটিয়ালী, মুর্শিদী ও মারিফতি গানে মন কেড়ে নিতো। সে সময় চিত্রা নদী বিধৌত নড়াইল ও পাশ্ববর্তী উপজেলাগুলোতে চলাচলের অন্যতম ও শৌখিন মাধ্যম ছিলো পালতোলা পানসি, গয়না, ছুঁইওয়ালা (একমালাই) ও রাজাপুরী নৌকা। এছাড়াও নড়াইলের জমিদারদের চলাচলের জন্য ময়ূরপঙ্খী, ধণাঢ্য ব্যক্তিদের জন্য বজরা এবং মালামাল পরিবহনের জন্য সাম্পান, বালার ও বাতনাই নৌকার প্রচলন ছিলো। কালের বিবর্তনে এখন চিত্রা নদীর অধিকাংশ দখল ও ভরাট হয়ে যাওয়ায় হারিয়ে গেছে প্রাচীণ ঐতিহ্যের চিরচেনা এসব নৌকা। এখন কালে ভদ্রে কোথাও এসব নৌকার দেখা মেলেনা। তবে এখনও বর্ষা মৌসুমে বিলাঞ্চলবাসীর যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনের একমাত্র বাহনই হচ্ছে নৌকা। জেলার হাজার হাজার মানুষের মৎস্য শিকারের কাজেও অন্যতম ভূমিকা রাখে নৌকা। নৌকায় জাল, চাই (মাছ ধরার ফাঁদ) অথবা বড়শি নিয়ে মৎস্য শিকারে ছুটে চলেন জেলেরা। তবে এসব নৌকাকে অঞ্চল ভেদে পেনিস, ডিঙ্গি, কোসা ও মাছ ধরার নৌকা বলা হয়। নৌকা পৃথিবীর অনেক দেশে ক্রীড়া ও প্রমোদের জন্য ব্যবহৃত হলেও নদীমাতৃক বাংলাদেশে নৌকা যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম। এছাড়া পণ্য পরিবহণ ও জেলেদের মাছ ধরার কাজে নৌকার ব্যবহার হয়ে থাকে। বাংলাদেশে বর্ষাকালে নৌকা প্রচুর ব্যবহার হয়। নৌকার চালককে বলা হয় মাঝি।

নৌকার বিভিন্ন অংশ হলো-খোল, পাটা, ছই বা ছাউনী, হাল, দাঁড়, পাল, পালের দড়ি, মাস্তল, নোঙর, গলুই, বৈঠা, লগি ও গুণ। নৌকা প্রধানত কাঠ দিয়ে তৈরি করা হয়। মাছ ধরার ডিঙ্গি আকারে ছোট, আবার পণ্য পরিবহণের নৌকা আকারে বেশ বড়। ছই বা ছাউনী তৈরিতে বাঁশ বব্যহার করা হয়। খোলকে জলনিরোধ করার জন্য আলকাতরা ব্যবহার করা হয়। লগি তৈরি হয় বাঁশ থেকে। পাল তৈরি হয় শক্ত কাপড় জোড়া দিয়ে। গঠনশৈলী ও পরিবহণের উপর নির্ভর করে বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের নৌকার প্রচলন রয়েছে যেমন-ছিপ, বজরা, ময়ূরপঙ্খী, গয়না, পানসি, কোষা, ডিঙ্গি, পাতাম, বাচারি, রপ্তানি, ঘাসি ও সাম্পান। নববইয়ের দশক থেকে বাংলাদেশে নৌকায় ইঞ্জিন লাগানো শুরু হয়। ফলে নৌকা একটি যান্ত্রিক নৌযানে পরিণত হয়। এ যান্ত্রিক নৌকাগুলি শ্যালো নৌকা নামে পরিচিত। সাম্পান নৌকা ।

বাংলাদেশের বিভিন্ন ধরনের নৌকার মধ্যে সাম্পান সবচেয়ে বেশি পরিচিত। এদেশের লোকগীতি ও সাহিত্যে সাম্পান নৌকার উল্লেখ পাওয়া যায়। উত্তাল ঢেউয়ে ভেসে বেড়ায় সাম্পান। এ নৌকাগুলির সামনের দিকটা উঁচু আর বাঁকানো, পিছনটা থাকে সোজা। প্রয়োজনে এর সঙ্গে পাল থাকে আবার কখনও থাকে না। এক মাঝিচালিত এই নৌকাটি মাল পরিবহণের জন্য ব্যবহৃত হয়। গয়না নৌকা আকৃতিতে মাঝারি ধরনের। মূলত যাত্রী পারাপারের কাজেই এ নৌকা ব্যবহার করা হতো। একসাথে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ জন পর্যন্ত যাত্রী বহন করার ক্ষমতা ছিল এই নৌকাটির। বর্তমানে গয়না নৌকা বিলুপ্তি হয়ে গেছে। বজরা নৌকা আগের দিনের ধনী লোকেরা শখ করে নৌকা ভ্রমণে যেতেন। তাদের কাছে বেশ জনপ্রিয় ছিল বজরা নৌকা। বজরাতে তারা এক রকম ঘরবাড়ি বানিয়ে নিতেন। ফলে এতে খাবার দাবারসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধাই থাকতো। কোনটিতে আবার পালও থাকতো। এতে থাকতো চারজন করে মাঝি। বাইচের নৌকা ॥ নৌকা বাংলাদেশে এতোটাই জীবনঘনিষ্ঠ ছিলো যে, এই নৌকাকে ঘিরে হতো অনেক মজার মজার খেলা।  তার মধ্যে নৌকাবাইচ এখনও একটি জনপ্রিয় খেলা। বাইচের নৌকা লম্বায় ১৫০ থেকে ২০০ ফুট পর্যন্ত হয়। প্রতিযোগিতার সময় এতে ২৫ থেকে ১০০ জন পর্যন্ত মাঝি থাকতে পারে। আগে নবাব-বাদশাহরা বাইচের আয়োজন করতেন। এইসব বাইচের নৌকার সুন্দর সুন্দর নাম দেওয়া হতো যেমন, পঙ্খীরাজ, দ্বীপরাজ, সোনার তরী প্রভৃতি। এখনও প্রতি বছর বরেণ্য চিত্রশিল্পী এস.এম সুলতান মেলা উপলক্ষ্যে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নৌকা বাইচের আয়োজন করা হয়ে থাকে। ময়ূরপঙ্খী নৌকা ॥ আগেকারদিনের রাজা বাদশাহদের সৌখিন নৌকার নাম হলো ময়ুরপঙ্খী। এর সামনের দিকটা দেখতে ময়ূরের মতো বলে এর নাম দেওয়া হয়েছিলো ময়ূরপঙ্খী। এ নৌকা চালাতে প্রয়োজন হতো চারজন মাঝি ও দুটো করে পাল। ডিঙ্গি নৌকা ॥ সবচেয়ে পরিচিত নৌকার নাম হচ্ছে ডিঙ্গি নৌকা। নদীর তীরে যারা বাস করেন তারা সকলেই এই নৌকাটি ব্যবহার করেন নদী পারাপার বা অন্যান্য কাজে। আকারে ছোট বলে এই নৌকাটি চালাতে একজন মাঝিই যথেষ্ট। মাঝে মাঝে এতে পালও লাগানো হয়। বালার ও বাতনাই নৌকা  প্রাচীনকালে ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য ব্যবহৃত বিখ্যাত নৌকার নাম ছিলো বালার ও বাতনাই। এই নৌকাগুলি আকারে অনেক বড় এবং প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ টন পর্যন্ত মালামাল বহন করতে পারতো। বৈঠা বাওয়ার কাজ করতো ১০ থেকে ১৫ জন মাঝি। এ ধরনের নৌকায় পাল থাকতো দুটো করে। কিন্তু এ ধরনের নৌকা এখন আর বাংলাদেশের কোথাও দেখা যায়না। বর্তমানে মাছধরা নৌকাই কেবল সগৌরবে প্রাচীণকালের নৌকার ঐতিহ্য ধরে রেখেছে, যা হারাবে না কোনোদিন। পেনিস নৌকা চাম্বল আর রেইনট্রি কাঠ দিয়ে তৈরি করা হয় ছোট আকারের কমদামি পেনিস নৌকা। বছরে একবার শুধু বর্ষা মৌসুমে ব্যবহারের জন্য এ নৌকা বেশি বিক্রি হয়ে থাকে। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই জমে উঠে নৌকার হাট। আর এ মৌসুমে নৌকা তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করেন জেলার বিশাল জনগোষ্ঠী। জৈষ্ঠ্য থেকে আশ্বিন মাস পর্যন্ত নড়াইলে রামসিদ্ধি এলাকায় বিশাল নৌকার হাট বসে। এছাড়াও বর্ষা মৌসুমের শুরু থেকেই বিভিন্নস্থানে চলে নৌকা বানানোর ধুম। ছুঁইওয়ালা (একমালাই) নৌকা ॥একসময় নৌকায় চড়ে দূরে কোথাও যাতায়াতের একমাত্র ও অন্যতম মাধ্যম ছিল পালতোলা পানসি ও ছুঁইওয়ালা (একমালাই) নৌকা। কালের বিবর্তনে পানসি নৌকা হারিয়ে গেলেও আজো দেখা মেলে ছুঁইওয়ালা নৌকার। কদিনবদলের সাথে সাথে এখন বদল হয়ে গেছে বিলাঞ্চলের জীবনমানের চিত্র। অধিকাংশ এলাকায় এখন সড়ক পথে যোগাযোগের জন্য উন্নত মানের রাস্তাঘাট নির্মান হয়েছে। যে কারনে ক্রমেই ওইসব এলাকা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে চিরচেনা নৌকা। বর্তমানে নড়াইল ফেরিঘাটে ফেরির বিকল্প হিসাবে কয়েকজন মাঝিকে নৌকা বাইতে দেখা যায়। এছাড়া নৌকার তেমন চাহিদা না থাকায় বর্তমানে নৌকার কারিগররা অন্য পেশায় ঝুঁকে পড়ছেন। সচেতন মহলের দাবি সরকার যদি নৌকা শিল্পে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করে তাহলে পুনরায় এ শিল্প গতিশীল হয়ে উঠবে।

নতুখবর/সোআ

Comments

comments

পাঠকের কিছু জনপ্রিয় খবর

নড়াইলে জনসাধারণের দুর্ভোগ কমাতে ২৮ লক্ষ টাকা ব্যয়ে খাল খনন


বিস্তারিত

নড়াইলে ২৪ ঘন্টা অভিযানে চালিয়ে তিন মাদক ব্যবসায়ীসহ ২৪ জন গ্রেফতার


বিস্তারিত

নড়াইলে ডিবির অভিযানে পিচ ইয়াবাও গাঁজাসহ ৩মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার


বিস্তারিত

লোহাগড়ায় সাংবাদিককে ফাঁসাতে নারী নির্যাতন আইনে মিথ্যা মামলা করলেন এক গৃহবধু


বিস্তারিত

নড়াইল জেলা পরিষদের উদ্যোগে ইফতার মাহফিল


বিস্তারিত

নড়াইলে গম সংগ্রহ অভিযানের উদ্বোধন


বিস্তারিত

নড়াইলে ঐতিহ্যের চিরচেনা বর্তমানে নৌকার কারিগররা অন্য পেশায় ঝুঁকে


বিস্তারিত

নড়াইলে কালের বিবর্তনে আজ বিলুপ্তির পথে বাংলার ঐতিহ্যবাহী সে যুগের পালকি ছিল এ যুগের মোটর গাড়ি


বিস্তারিত

প্রতিবেশীকে পানি দিতে না পারো মাদক দিও না’ নড়াইল পুলিশ সুপার সরদার রকিবুল ইসলাম


বিস্তারিত

নড়াইলে বিদ্যুৎবিহীন ১৩৪টি বিদ্যালয় ডিজিটাল শিক্ষাবঞ্চিত শিক্ষার্থীরা


বিস্তারিত

নড়াইলের বুড়িখালি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাঠদান চলছে মুরগির খামারে


বিস্তারিত

নড়াইলে ডিবি পুলিশের পৃথক দু’টি অভিযানে ৬৬ পিচ ইয়াবাসহ গ্রেফতার ২


বিস্তারিত

নড়াইলে পার্টস ব্যাবসায়ীকে কুপিয়ে ৬০ হাজার টাকা ছিনতাই


বিস্তারিত

নড়াইলে উদ্ধারকৃত অজ্ঞাত লাশ সনাক্ত থানা মামলা র‌্যাবের সহযোগিতায় ৪ জন গ্রেফতার


বিস্তারিত

নড়াইলে কালবৈশাখীতে বিধ্বস্ত ৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্লাস চলছে দোকানঘর ও নারকেল গাছের নিচে


বিস্তারিত

নড়াইল লাইব্রেরিতে বই-পত্রিকা সংকট চরমে : বিপাকে পড়ছেন পাঠকেরা


বিস্তারিত

নড়াইলে ডিবি পুলিশের গাড়ি তল্লাশীকালীন সময় ভারতীয় মদসহ গ্রেফতার ১


বিস্তারিত

নড়াইল পুলিশ সুপার সরদার রকিবুল ইসলাম কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পেলেন শের-ই-বাংলা স্মৃতি পদক


বিস্তারিত